কলকাতা শহর হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহর। পূর্ব ভারতের বৃহত্তম শহর এই কলকাতা। ভারতের সকল মহানগরগুলার মধ্যে কলকাতা শহর টি অন্যতম। একজন নতুন পর্যটক প্রথম দর্শনেই কলকাতা শহর কে দেখে একটু বিরক্ত ও অনেকটা মুগ্ধ হবেন। তাই এই শহরটিকে সহজে উপেক্ষা করা সবার পক্ষে সম্ভব না।

কলকাতার ইতিহাসঃ
গঙ্গা বা ভাগীরতী নদীর পূর্ব পাড়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহর কলকাতা। তার বয়স প্রায় সাড়ে তিনশো বছর।অনেকেই বলেন কলকাতা এক আজব শহর। আবার কেউ বলেন কলকাতা এক মিছিল নগরী।আবার কারো মতে কলকাতা এক বস্তির শহর। কলকাতার আরেক নাম কাসাদ নগর। ১৬৯০ খৃষ্টাব্দে জব চাঙ্স গোবিন্দপুর, সুতানোটি ও কলিকেতা কে কেন্দ্র করে কলকাতার পতন করেন।১৭৭২ সালে মর্শিদাবাদ শহর থেকে বাংলার রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়।১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিলো ভারতের বিট্রিশ শাসনের রাজধানী। ২০০১ সালে সরকারি ভাবে এই অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে ক্যালকাটা থেকে বাংলায় কলকাতা করা হয়।
কলকাতা নামকরণের ইতিহাসঃ
কলকাতা নামকরণের পিছনে লোকমুখে অনেক গল্প বা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। যদিও গল্প গুলার কোনো ভিত্তি আজো পাওয়া যায় নি। এরকম ই এক গল্প থেকে জানা যায়, একদিন এক ইংরেজ সাহেব এক রাস্তায় যাওয়ার সময় স্থান টির নাম জানার আগ্রহ করেন।তখন পাশেই এক কৃষক ঘাস কাটছিলো। তখন তিনি সেখানে গিয়ে তাকে ইংরেজি তে স্থানটির নাম জিজ্ঞাসা করলেন। যেহেতু লোকটি ইংরেজি জানতো না। সে ভাবে তাকে হয়তো ঘাস কবে কাটা জিজ্ঞাসা করছে। তাই সে বলেছিলো কালকাটা। সাহেব তখন উচ্চারণ ক্যালকাটা। তবে কলকাতা নামকরণের পিছনে যে সঠিক তথ্য জানা যায় তা হলো কলিকাতা অর্থ্যাৎ কলি চুনের জন্য কাটা।
কলকাতার সেরা ২১টি দর্শনীয় স্থান
কলকাতা যাবেন আর এইসব স্থান গুলা ঘুরে দেখবেন না তা হয় নাকি। এজন্যই তো কলকাতা শহরে সেরা স্থান কোন গুলা দেখে নিন এক নজরে। আজ আমরা এই আর্টিকেলে কলকাতা শহরের দর্শনীয় স্থান গুলা সম্পর্কে জানবো।১। ভিক্টোরিয়া মেমরিয়ালঃ
কলকাতা শহর ভ্রমনে গিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল না দেখলে আপনার কলকাতা শহর ভ্রমন টা ই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি ধরে আছে এই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। পরিবার নিয়ে ১ দিনের ছুটি কাটানোর জন্য বেশ ভালো স্থান এই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।এটি কলকাতার একটি আইকনিক স্থাপনা। এটি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার রানী ভিক্টোরিয়ার একটি স্মৃতিসৌধ যা বিশাল এলাকা জুড়ে থাকার নজর কাড়বে আপনারও।
২। সায়েন্স সিটিঃ
ভারতে বৃহৎতম বিজ্ঞান কেন্দ্র এটি। আপনার যদি বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ থাকে অবশ্যই এই স্থান টি ঘুরে দেখবেন।বাচ্চাদের নিয়ে এই স্থান টি ভ্রমন করার জন্য বেস্ট অপশন হবে কারন এটা বাচ্চাদের জন্য শিক্ষা সফরের মতো উপকারী হবে।৩। হাওড়া ব্রীজ/রবীন্দ্র সেতুঃ
কলকাতা শহরের বেশ জনপ্রিয় স্থান এই হাওড়া ব্রীজ। ১৯৪৫ সালে এটি তৈরি করা হয়। ১৯৬৫ সালে নাম পরিবর্তন করে রবীন্দ্র সেতু করা হয়। এই হাওড়া ব্রীজ দেখে নিতে পারেন আপনি অন্য যেকোন স্পটের সাথে ই।৪। ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামঃ
ভারতের সব থেকে প্রাচীন ও বড় জাদুঘর এটি। এটি ভ্রমন করলে আপনি প্রাচীন ঐতিহ্য জানার পাশাপাশি আরো অনেক পুরাতন জিনিস দেখে নিতে পারবেন। একমাত্র কলকাতা মিউজিয়ামে আপনি মিশরীয় আসল মমি দেখতে পারবেন। ভারতে আর কোথাও আসল মমি দেখতে পাবেন না।৫। নন্দন সংস্কৃতি কেন্দ্রঃ
কলকাতার একমাত্র বৃহৎ সংস্কৃতি কেন্দ্র এই নন্দন সংস্কৃতি কেন্দ্র। একমাত্র বহৎ চলচ্চিত্র কেন্দ্র এই নন্দন সংস্কৃতি কেন্দ্র। কলকাতা থিয়েটার দেখতে চাইলে অনায়াসে চলে যেতে পারেন এই নন্দনে।৬। মাদারস ওয়াক্স মিউজিয়ামঃ
মাদারস ওয়াক্স মিউজিয়াম কলকাতার নিউ টাউনে অবস্থিত মোম শিল্পের একটি জাদুঘর। ২০১৪ সালে নভেম্বর মাসে একটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতের প্রথম মোম শিল্পের জাদুঘর। এখানে বিখ্যাত ব্যাক্তিদের মোমের তৈরি মুর্তি রয়েছে।৭। বেলুর মঠঃ
বেলুর মঠ হলো রামকৃষ্ণ পরমহংসের পদাংশিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশরের প্রধান কার্যালয়। ১৯৩৫ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের জন্য শুধুমাত্র হিন্দু পর্যটকেরা ই নয়,সকল ধর্মের মানুষ এটা দেখতে আসে।এর পাশে নদীর পরিবেশ টা ও সবার নজর কাড়ে।৮। উত্তর কলকাতাঃ
আসল কলকাতার স্বাদ পেতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই উত্তর কলকাতা ঘুরে দেখতে হবে। উত্তর কলকাতার কুমারটুলি তে অজস্র মূর্তির রুপ দেখতে পারবেন। এছাড়া শোভা বাজারের গলি ধরে হাটলে পুরান কলকাতার স্বাদ টা পুরোপুরি পাবেন।৯। নিউটাউন ইকো পার্কঃ
নিউটাউন ইকোপার্কে আপনি স্পোর্টস জোন পাবেন। এছাড়াও পৃথিবীর ৭ টি আশ্চর্যের পথিকৃতিও দেখা মিলবে এখানে।১০। কফি হাউজঃ
মান্না দের কফি হাউজের সেই আড্ডা টা গান টা শোনেন নি এমন খুব কম মানুষ ই আছেন।এই কফি হাউজ টা সেই তার স্মৃতি বহন করেই টিকে আছে।এটি উত্তর কলকাতা তে অবস্থিত।১১। কলেজ স্ট্রিট এর বই পাড়াঃ
কলেজ স্ট্রিট এর বই পাড়া তে রয়েছে বইয়ের বিরাট সংগ্রহশালা। যারা বই প্রেমী তারা এই জায়গা টা ঘুরে দেখতে ভুলবেন না। এতো বিশাল বাংলা বইয়ের সমাহার হয়তো আর কোথাও নেই।এটি উত্তর কলকাতা তে অবস্থিত।১২। প্রিন্সেফ ঘাটঃ
প্রিন্সেফ ঘাট কলকাতার হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত একটি ঘাট।এটি কলকাতার পুরনো দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। এখানে সবসময়ই অনেক পর্যটক আসেন।এখান থেকে চাইলে আপনি নৌকা ভ্রমনেও বের হতে পারবেন।১৩। নাখোদা মসজিদঃ
কলকাতার সবচেয়ে বড় মসজিদ এই নাখোদা মসজিদ।এটি মধ্য কলকাতায় অবস্থিত।এটি বড় বাজার এলাকার জাকারিয়া স্ট্রিট ও রবীন্দ্র সরণী সংযোগস্থলে নির্মিত হয়েছে। ১৯২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এই মসজিদ টি স্থাপিত হয়। তখন এটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিলো প্রায় ১৫ লক্ষ রুপি। একসাথে একসময়ে ১০ হাজার জন মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারে।১৪। মার্বেল প্যালেসঃ
৩ তলা বিশিষ্ট ভবনের সম্পুর্ণ টা ই অত্যন্ত দামী মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি তাই এই ভবনের নামকরন করা হয়েছে মার্বেল প্যালেস।এই প্যালেসের সামনে বাগানে ভাস্কর্য গুলাও দামি মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি এবং ভেতরে রয়েছে অসংখ্য ব্যাক্তির ভাস্কর্য, পেইন্টিং যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে অনায়সে।১৫। সেন্ট পন্থস ক্যাথিড্রালঃ
সেন্ট পন্থস ক্যাথিড্রাল কলকাতার বৃহত্তর একটি চার্চ।এটি নির্মান কাজ সম্পন্ন হয়েছিলো ১৮৪৭ সালে।এটি এতোটাই সুন্দর যে সব ধরনের পর্যটক এখানে আসেন এর সৌন্দর্য দেখতে।১৬। ঝুলন্ত রেস্টুরেন্টঃ
ঝুলন্ত রেস্টুরেন্ট টি কলকাতার নিউটাউনে বিশ্ব বাংলা গেটে অবস্থিত।এটি কলকাতার প্রথম ঝুলন্ত রেস্টুরেন্ট।দেখতে চমৎকার আকৃতির হওয়ায় ইতিমধ্যে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে এই স্থান টি।১৭। চায়না টাউনঃ
চায়না টাউন বা টেরিটি বাজার।কলকাতায় বসে চায়না খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে এই স্থানের জুড়ি নেই।এটি কলকাতার বহৎ চায়না বাজার। এখানে চিনা রা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের খাবার গুলা যত্ন সহকারে প্রস্তুত করে।১৮। মিলিনিয়াম পার্কঃ
শহরের মাঝে গঙ্গার তীরে চমৎকার একটি পার্ক এই মিলিনিয়াম পার্ক।সকাল ১১ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই পার্কটি। আপনি নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে এই পার্কে বসে সময় কাটাতে পারেন।১৯। ফোর্ট উইলিয়ামঃ
ফোর্ট উইলিয়াম কলকাতা শহরে অবস্থিত একটি দুর্গ।প্রাশ্চে বৃটিশ শক্তির সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো ফোর্ট উইলিয়াম।১৭০০ সালে এটি নির্মান হয়।শুরুতে এটি সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে এটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।২০। বিরলা তারামন্ডলঃ
মহাজাগতিক বস্তু গুলা নিয়েই এই বিরলা তারকামন্ডল। কারো যদি মহাবিশ্বের বস্তু গুলা নিয়ে আগ্রহ থাকে তাহলে অবশ্যই এই বিরলা তারামন্ডল দেখে নিতে পারেন।এখানে গেলে আপনার মনে হবে আপনি একজন মহাকাশ চারী হয়ে গেছেন।বর্তমানে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে এটি আরো সুন্দর ভাবে তৈরি করা হয়েছে।
২১। আলীপুর চিড়িয়াখানাঃ
আপনি যদি বন্যপ্রাণী পছন্দ করেন তাহলে অবশ্যই ঘুরে দেখতে পারেন আলীপুর চিড়িয়াখানা টি৷ আপনার সময় এখানে ভালো কাটবে।Frequently Ask Question
প্রশ্নঃ কলকাতার কাছাকাছি ঘোরার জায়গা?
উত্তরঃ কলকাতার কাছাকাছি ঘোরার জায়গার মধ্যে অন্যতম স্থানগুলো হলো হেনরি আইল্যান্ড, শান্তিনিকেতন, জয়পুর ফরেস্ট, দীঘা, তালসারি এবং তাজপুর, ঝাড়গ্রাম, মুকুটমণিপুর।
প্রশ্নঃ কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান কোনটি?
উত্তরঃ কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থানের মধ্যে রয়েছে হাওড়া ব্রিজ, পার্ক স্ট্রিট, নিউ মার্কেট, সাউথ পার্ক সিমেট্রি এবং ওল্ড চায়নাটাউন। আপনি চাইলে কলকাতার এই বিখ্যাত স্থানগুলো ঘুরে আসতে পারেন।প্রশ্নঃ কলকাতা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে?
উত্তরঃ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৯০ সালে বাংলায় বাণিজ্য বিস্তারের জন্য কলকাতা শহরে পদার্পণ করে। সেখান থেকে কলকাতার ইতিহাসের শুরু হয়। জব চার্নক নামে কোম্পানির এক প্রশাসককে ঐতিহাসিকগণ কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন।
প্রশ্নঃ কলকাতার বিখ্যাত খাবার কি?
উত্তরঃ কলকাতার বিরিয়ানি এই যে দেশের সেরা ও বিখ্যাত খাবার এই কথা কলকাতার সকল খাদ্যরসিক মানুষ স্বীকার করবেন। সেই সাথে বিরিয়ানির সাথে এখানকার লাচ্ছা পরটা, মটন রেজালা বা মটন কোফতাও দারুণ বিখ্যাত।
দক্ষিণ কলকাতার দর্শনীয় স্থান?