হাওরে বোরো ধানের মহাবিপর্যয়: ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি, নিঃস্ব হওয়ার পথে লাখো কৃষক - BanglaInfo24

অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর জনপদে বোরো ধানের মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও সীমান্ত নদী দিয়ে নেমে আসা পানির তোড়ে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির আধপাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে এই দুই জেলায় অন্তত ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। চোখের সামনে সোনালি ফসল পচে নষ্ট হতে দেখে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হাহাকারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাওরের প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এখানকার ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা পাহাড়ি ঢলের চাপ সামলাতে পারছে না। শ্রমিক সংকট এবং কোমর সমান পানিতে হারভেস্টার মেশিন চালাতে না পারায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত গতিতে ধান কাটতে পারছেন না, ফলে পানিতে থাকা অবশিষ্ট ধানগুলো দ্রুত পচে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলার প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। এতে ৩২ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জীবনঝুঁকি নিয়ে কৃষকরা কিছু ধান কাটার চেষ্টা করলেও বারবার বজ্রপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ধনু ও মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানের পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে।

প্রকৃতির এমন রুদ্রমূর্তিতে হাওরজুড়ে এখন লাখো কৃষকের নিঃস্ব হওয়ার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। ধান কাটার শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ঝোড়ো বাতাস ও বজ্রপাতের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ শীতল পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। অনেক এলাকায় পাকা ধান কাটার সুযোগ না পাওয়ায় ঋণগ্রস্ত কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষি যন্ত্রপাতির অভাব এবং বৈরী আবহাওয়ার এই দ্বিমুখী চাপে ফসলের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পাহাড়ি ঢল আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। এমতাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিশেষ ত্রাণ ও প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হলেও মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সহায়তা কতটা কৃষকের দুর্ভোগ লাঘব করবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, হাওর জনপদে এখন শুধুই কষ্টের ফসল হারানোর বেদনা আর কান্নার রোল।



from Newsbangla24 RSS Feed
নবীনতর পূর্বতন