বাংলাদেশের নদ নদী সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। জালের মত এই নদী পুরো বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। এত অল্প আয়তনের মধ্যে এত বেশি নদনদী পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, কর্ণফুলী ইত্যাদি বড় বড় নদী এবং এদের উপনদী ও শাখা নদীর শাখা-প্রশাখা ভূখণ্ডের বুক চিরে শিরা উপশিরার মত সাগর পানে বয়ে চলেছে।

এদেশের প্রায় সকল প্রধান শহর নগর বাণিজ্য কেন্দ্র বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। যেমন- বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা মহানগরী, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ, কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে ময়মনসিংহ।
 

নদ ও নদীর মধ্যে পার্থক্যঃ

নদ এবং নদীর পার্থক্য হলো মূলত ব্যাকরণগত। এছাড়া আলাদা সেমন কোনো পার্থক্য নাই। যে সকল নদীর নাম নারীবাচক তাদের কে বলা হয় থাকে নদী। আর যে সকল নদীর নাম পুরুষবাচক তাকে বলা হয় নদ।

বাংলা ভাষায় নারীবাচক শব্দের শেষে আ-কারান্ত, ই-কারান্ত এবং উ-কারান্ত যুক্ত হয়। নদীর নামের শেষে সেরুপ আ,ই,উ কারান্ত না থাকলে তাকে নদ বলে।

বাংলাদেশের নদ নদীর সংখ্যাঃ

বাংলাদেশের প্রায় ৭০০টি নদী উপনদীর সমন্বয়ে নদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। মাকড়সার জালের মত এসব এলাকা কে বেষ্টন করে অসংখ্য নদ নদী রয়েছে।  

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে নদনদীর সংখ্যা অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গবেষণা মতে বাংলাদেশের নদীর সংখ্যা ৪০৫ টি।

নদ নদীর দৈর্ঘ্যঃ

বাংলাদেশের নদ নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। তবে অনেক তথ্য থেকে ২২ হাজার ১৫৫ কিলোমিটার ও জানা যায়।  বর্ষাকালে নদীর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, বর্তমানে অনেক নদী ভরাট হয়ে হারিয়ে গেছে এজন্য সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ নদীর দৈর্ঘ্যঃ

নদী দৈর্ঘ্য বিস্তারিত
মেঘনা নদীর দৈর্ঘ্য ৩৩০ কি.মি. গড় দৈর্ঘ্য ১৫৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৪০০ মিটার।
কর্ণফুলী নদীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কি.মি.
সাঙ্গু নদীর দৈর্ঘ্য ২০৮ কি.মি. গড় দৈর্ঘ্য ২৯৪ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ১১৯ মিটার।
তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ৩১৫ কি.মি, তার মধ্যে ১১৫ কি.মি. বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত।
পশুর নদীর দৈর্ঘ্য ১৪২ কি.মি, দৈর্ঘ্য ১৪২ কি.মি, এবং প্রস্থ ৪৬০ মিটার থেকে ২.৫ কি.মি.।
মাতামুহুরি নদীর দৈর্ঘ্য ১২০ কি.মি, গড় দৈর্ঘ্য ১৪৬ কি.মি. এবং গড় প্রস্থ ১৫৪ মিটার।
নাফ নদীর দৈর্ঘ্য ৬৩ কিলোমিটার গড় প্রস্থ ১৩৬৪ মিটার।

নদ ও নদীর প্রকারভেদঃ

ডঃ মোনতাসির মামুন বাংলাদেশের নদীগুলোকে মোট পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন। ১. গঙ্গা বা পদ্মা এবং ব-দ্বীপের। ২. মেঘনা ও সুরমা প্রবাহ। ৩. ব্রহ্মপুত্রের শাখা-প্রশাখা।৪. উত্তরবঙ্গের নদী সমূহ। ৫.পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল ভূমির নদী
 

গঙ্গা বা পদ্মা এবং এর বদ্বীপঃ

হিমালয় পর্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে নির্গত ভাগীরথী নাম ধারণ করে ভারতের হরিদ্বারের নিকট সমভূমিতে পৌঁছেছে। এই ধারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাজ রাজমহল পাহাড়ের পাশ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে।
 
এরপর রাজশাহী জেলায় বাংলাদেশের ভারত সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১১২ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা নামে কুষ্টিয়া জেলার উত্তর-পশ্চিম দিয়ে বাংলাদেশের প্রবেশ করেছে। অতঃপর গোয়ালন্দের কাছে যমুনা সঙ্গে মিলিত হয়ে চাঁদপুরের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।
 
পদ্মার মোট দৈর্ঘ্য ৩২৪ কিলোমিটার। পদ্মা নদীর শাখা নদী গুলো হল কুমার, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ ইত্যাদি।

মেঘনা ও সুরমা প্রবাহঃ

বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী মেঘনার দৈর্ঘ্য ৬৬৯ কিলোমিটার। এই নদীটির উৎপত্তি ভারতের শিলং ও মেঘালয় পাহাড়ে। নাগাল্যান্ড ও মনিপুর জল বিভাজিকার ঢালে উৎপন্ন বরাক এই নদীর প্রধান উৎস। 
 
সিলেট জেলায় অমলসিদে বাংলাদেশ সীমান্তে বরাক নদী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বাংলাদেশের প্রবেশ করেছে। আজমেরিগঞ্জ এর কাছে উত্তর সিলেটের সুরমা এবং হবিগঞ্জের কারণে নদী এক সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তিতাস, গোমতী, মনু, বাউলাই ইত্যাদি হলো মেঘনার উপনদী।

ব্রহ্মপুত্র শাখা প্রশাখাঃ

ব্রহ্মপুত্র নদী তিব্বতের মাল সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে সাংপো নামে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে উৎপত্তি হয়েছে। নদীটির পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে কুড়িগ্রাম জেলার মাজাহারালীতে দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
 
এখান থেকে নদীর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র -যমুনা। তবে এটি সমাধিক যমুনা নামেই পরিচিত। এই নদী প্রণালীর উপনদী গুলো হচ্ছে ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, করোতোয়া ও আত্রাই। করোতোয়া যমুনার দীর্ঘতম উপনদী। শীতলক্ষ, বংশী হলো  যমুনার উপনদী।

উত্তরবঙ্গের নদীসমূহঃ

উত্তরবঙ্গের প্রধান নদীগুলি হল মহানন্দা, তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, কালজানি ও রায়ডাক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলভূমির নদীঃ

চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী। এটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এর উৎপত্তিস্থল ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড়। রাঙ্গামাটি এবং বন্দর নগরীর চট্টগ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি পতেঙ্গা সন্নিকটে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
 
কর্ণফুলী নদীর দৈর্ঘ্য ২৭৪ কিলোমিটার। কাপ্তাই নামক স্থানে এই নদীর উপর বাদ দিয়ে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী হচ্ছে ফেনী, মুহুরী, মাতামুরি, সাঙ্গু, বাকখালি ও নাফ নদী।

বাংলাদেশের নদনদীর পূর্ব ও বর্তমান নামঃ

  • পদ্মা নদীর পূর্ব নাম ছিলোঃ কীর্তিনাশা।
  • যমুনা নদীর পূর্ব নাম ছিলোজোনাই।
  • ব্রাহ্মপুত্র নদীর পূর্ব নাম ছিলোঃ লৌহিত্য।
  • বুড়িগঙ্গা নদীর পূর্ব নাম ছিলোঃ দোলাই।

বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রবেশপথঃ

  • পদ্মা  নদীর প্রবেশ পথঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ। 
  • মেঘনা নদীর প্রবেশেথঃ সিলেট।
  • ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবেশপথঃ কুড়িগ্রাম।
  • কর্ণফুলী  নদীর প্রবেশপথঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম।
  • তিস্তা নদীর প্রবেশপথঃ নীলফামারী।

Frequently Ask Question

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের প্রধান নদ নদী কোনগুলো?
বাংলাদেশের প্রধান নদী সমূহ হলো পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, তিস্তা, গোমতী নদী। 

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে কয়টি নদ আছে?
বাংলাদেশের নদের সংখ্যা ৪ টি।
 
প্রশ্নঃ বাংলাদেশের নদের নামগুলা কি?
বাংলাদেশে নদের সংখ্যা চারটি। যথাঃ-কপোতাক্ষ, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদ। 

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের জাতীয় নদী কোনটি?
বাংলাদেশের জাতীয় নদীর নাম যমুনা।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী কোনটি?
বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদীর নাম মেঘনা।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম নদীর নাম কি?
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম নদীর নাম গোবরা।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের প্রশস্থ নদী কোনটি?
বাংলাদেশের প্রশস্থ যমুনা।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের খরস্রোতা নদী কোনটি?
বাংলাদেশের খরস্রোতা নদী কর্ণফুলী।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশের র্দীঘতম নদ কোনটি?
বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র।

প্রশ্নঃ  ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থান বিশ্বে কততম? 
ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থান বিশ্বে ২২তম।
 
বাংলাদেশে কতটি নদী আছে?
সাত সমুদ্র তেরো নদী কী কী?
নদী সংখ্যা ৭০০ টি কিংবা ২৩০ টি বলা হয় কীসের ভিত্তিতে?
ভারতে উৎপত্তি নদীর সংখ্যা কতটি?
বাংলাদেশে নদী কতগুলি?
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা কটি?
বাংলাদেশের সবচেয়ে লবণাক্ত নদীর নাম কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট নদীর নাম কী?

শেষ কথাঃ

আমরা এই আর্টিকেলে বাংলাদেশ নদনদী সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করেছি। আশা করি এই তথ্য গুলা আপনাদের ভালো লাগবে এবং উপকারে আসবে।
তাসমিম বর্ষা

আমি একজন স্টুডেন্ট। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি অবসর সময়ে লেখালেখি করতে পছন্দ করি।

নবীনতর পূর্বতন