আমাজনের পরেই পদ্মা একটি খরস্রোতা নদী। এই নদী বাংলাদেশকে তার রাজধানী ও দক্ষিণ অংশ কে উত্তর পূর্ব অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছে। পিছিয়ে পড়া ২১ টি জেলাকে সংযুক্ত করতে এবং উন্নয়নের দিকে আনতেই সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ আমরা পদ্মা সেতু সম্পর্কে সকল তথ্য জানতে চেষ্টা করবো।

এক নজরে পদ্মা সেতুর প্রকল্পের আদ্যপান্তঃ
বাসেক ২০১০ সালের এপ্রিলে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্পের জন্য প্রাকযোগ্যতার আবেদনের মাধ্যমে আহ্বান করে। পদ্মা সেতুর প্রকল্প টা কে বহুমুখী সেতু প্রকল্প হিসেবে নামকরন করা হয়। ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন এর মধ্য দিয়ে এর সূচনা করে।
পদ্মা সেতুর জন্য ৯১৮ হেক্টর জমির অধিগ্রহন করা হয়। ২০১১ সালে সেতু নিমার্ন বিষয়ক চুড়ান্ত পরিকল্পনা শেষ হয়। এর পর ই দুর্নীতির অভিযোগে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।মামলার সুনানীর শেষে আবার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ৭ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে এবং ২৮ অগ্রহায়ন,১৪২২ বঙ্গাব্দ, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মুল সেতু নির্মান কাজের শুভ উদ্বোধন হয়।
পদ্মা সেতুর ডিজাইনঃ
পদ্মা সেতুর ডিজাইনের প্রনয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে MAUNSELL AECOM কে নিয়োগ দেওয়া হয়।পদ্মা সেতুর নকশা করা হয় হংকংয়ে। সেতুর নকশাকার এইসিওএম (American Multinational Engineering Firm)। পদ্মা সেতুর ডিজাইন করার সময় ৩ টি বিষয় কে মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়।
- সবসময় পরিবর্তনশীল স্রোতধারা
- প্রচুর পলিযুক্ত পদ্মার তলদেশের স্রোত
- পদ্মার ভাঙ্গন প্রবন তীর।
এই সকল বিষয়ের জন্য অন্য সেতুর তুলনায় পদ্মা সেতু তৈরি ছিলো এক ধরনের প্রায় অসম্ভব এবং চ্যালেন্জিং।
পদ্মা সেতুর অন্যতম বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
- পদ্মা সেতুর স্থায়ীত্ব ১০০ বছর।
- সেতুর সক্ষমতা দৈনিক ৭৫ হাজার যানবাহন
- এই সেতুতে ভূমিকম্প প্রতিরোধে ব্যবহার করা হয়েছে ফিকশ্যান পেনদুলাম বেয়ারিং। যার কারনে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় এই সেতু।
- একই সাথে রেলওয়ে এবং রোড ওয়ে বিশিষ্ট বহূমখী সেতু এটি।
- সেতু তৈরির উপাদান ছিলো কংক্রিট এবং স্টীল।
পদ্মা সেতুর সংযোগ এরিয়াসমূহঃ
পদ্মা সেতুর সংযোগ ও সার্ভিস এরিয়াকে ৩ টি অংশে ভাগ করা হয়। ৩টি সড়ক সুবিধা ও সংযোগ সুবিধার জন্য আলাদা ভাবে পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়।
১. মাওয়া সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া -০১
- এর দৈর্ঘ্য ১.৬৭ কিলোমিটার
- চুক্তি মূল্য ১৯৩.৪০ কোটি টাকা
২. সার্ভিস এরিয়া -০২
- নিমার্নকারী প্রতিষ্ঠান -আব্দুল মোমেন লিমিটেড (বাংলাদেশ)
- চুক্তি মূল্য ২০৮.৭১ কোটি টাকা।
৩.জাজিরা সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-০৩
- এর দৈর্ঘ্য ১০.৫৭ কিলোমিটার
- চুক্তি মূল্য ১৩১৮.৯৯ কোটি টাকা
- নিমার্নকারী প্রতিষ্ঠান -আব্দুল মোমেন লিমিটেড (বাংলাদেশ)
- হাইওয়ে কনস্ট্রাকশন এন্ড মেইনটেইন্স (মালয়েশিয়া)
সংযোগ সড়ক গুলা ২০১৩ সাল থেকে নিমার্ন শুরু মাধ্যমে কাজ শুরু হয়।
মূল সেতুর নিমার্ন তথ্যসমূহঃ
মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। নিমার্নকারী প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রীজ ইন্জিনিয়ারিং গ্রুপ কো.লি.। এর চুক্তি মূল্য ছিলো ১২১৩৩.৩৯ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু তৈরিতে ব্যবহার করা হয় কংক্রিট এবং স্টীল।
পদ্মা সেতুর জন্য পাইল তৈরি করা হয়। পাইল তৈরিতে চীন থেকে স্টীল আনা হয়। পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট এবং পাইল সংখ্যা ২৮৬ টি। প্রতিটি পাইলের ব্যস ৩ মিটার। প্রতিটি পিলারের জন্য ৬ টি পাইলিং তৈরি করা হয়। পাইল ড্রাইভিং শেষ হলে পাইলের মধ্যে মাটি ও বালু সরিয়ে ১০ মিটার কংক্রিট বেস ও ৬০ মিটার কমপ্যাক্টটেড স্যান্ড ফিলিং পূর্ণ করা হয়।
স্কাউরিং বিবেচনায় পদ্মা সেতুতে ১২২ মিটার গভীরতায় ৩ মিটার ব্যাসের পাইপ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।এছাড়াও ৭ টি পিলারের মাধ্যমে নদীর অভ্যন্তরে আলাদা ভাবে তৈরি করা হয়েছে ৪০০ কিলোভোল্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।
পদ্মা সেতুর স্প্যানঃ
পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানোর জন্য চীন থেকে আনা হয় ৪০০০ মেট্রিকটন ক্ষমতাসম্পন্ন ভাসমান ক্রেন।একটি স্প্যান এর ওজন ৩১০০ মেট্রিকটন।পদ্মা সেতুতে মোট স্প্যান সংখ্যা ৪১ টি। ৪১ তম স্প্যান টি ১০ ডিসেম্বর ২০২০ সালে বসানোর মাধ্যমে স্প্যান বসানোর কার্যক্রম শেষ করা হয়।
পদ্মা সেতুর পিলার ও স্ল্যাবঃ
পদ্মা সেতুতে উপরের ডেকে রোডওয়ে এবং নিচের ডেকে রেলওয়ে নিমার্ন করা হয়েছে। রোডওয়ে এবং রেলওয়ে স্ল্যাবগুলা ক্রেনের সাহায্যে বসিয়ে পোস্টটেনশনিং এর মাধ্যমে পরস্পর যুক্ত করা হয়েছে। ৫৯০০ টি স্ল্যাবে নির্মিত হয়েছে সেতুর উপরের ডেকের রোডওয়ে এবং নিচের ডেকের রেলওয়ে। ৫ টি স্তরে তৈরি হয়েছে সেতির ২২ মিটার প্রস্থ ৪ লেনের সড়ক।
মূল সেতুর সাথে সংযুক্ত করতে মাওয়া প্রান্তে ৩৯ টি পিলার ১৪৭৮ মিটার এবং জাজিরা প্রান্তে ৪২ টি পিলার ১৬৭০ মিটারের ২ টি রোড নিমার্ন করা হয়েছে। মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে মূল সেতুতে রেল চলাচলের জন্য নির্মিত হয়েছে ১৪ টি পিলারের উপর ৫৩২ মিটার দীর্ঘ ২ টি রেলভ্রাইডাট। মূল সেতুতে পিলার সংখ্যা ৪২ টি।
স্বপ্নের পদ্মা রেলসেতু দিয়ে ১৪.০৩.২৩ তারিখে প্রথম রেলওয়ে লোকোমোটিভ ৬৩১১ প্রবেশ করে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাকলো।
পদ্মা সেতুর বিস্তারিতঃ.
- পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয় ২৫ জুন ২০২২ সালে।
- পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার (২০.২০০ ফুট)
- পদ্মা সেতুর প্রস্থ ১৮.১০ কিলোমিটার (৫৯.৪ ফুট)
- পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
- পদ্মা সেতুতে ল্যাম্পপোস্টের সংখ্যা ৪২৫ টি।
- পদ্মা সেতু চালু হয় ২৬ জুন, ২০২২ সালে।
- আশা করা যায় ২০২৩ সালের জুন থেকে পদ্মা সেতুতে রেল চলাচল শুরু হবে।
- পদ্মা সেতুর আকৃতি ইংরেজি এস অক্ষরের মতো।
পদ্মা সেতুর টোলসমূহঃ
পদ্মা সেতুর টোল আদায়ের জন্য ২০২২ সালের ১২ আগস্ট সরাসরি এক আলোচনায় জি টু জি এর ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন কে। পদ্মা সেতুর বর্তমান টোলের পরিমান জেনে নেওয়া যাক
| # | যান-বাহন | টোলের পরিমান |
|---|---|---|
| ১ | মোটর সাইকেল | ১০০ টাকা |
| ২ | কার / জীপ | ৭৫০ টাকা |
| ৩ | পিক আপ | ১২০০ টাকা |
| ৪ | মাইক্রো বাস | ১৩০০ টাকা |
| ৫ | মিনি বাস | ১৪০০ টাকা |
| ৬ | মাঝারি আসনের বাস | ২০০০ টাকা |
| ৭ | বড় বাস | ২৪০০ টাকা |
| ৮ | ছোট ট্রাক (up to 5 tonnes) | ১৬০০ টাকা |
| ৯ | মাঝারি ট্রাক (5-8 tonnes) | ২১০০ টাকা |
| ১০ | ট্রাক (8-11 Tonnes) | ২৮০০ টাকা |
| ১১ | ট্রাক (3 axle) | ৫৫০০ টাকা |
| ১২ | ট্রেইলার (4 axle) | ৬০০০ টাকা |
| ১৩ | ট্রেইলার (4 axle above) | ৬০০০ টাকা+ |
পদ্মা সেতু নিয়ে সম্ভাবনাঃ
আশা করা হয় এই সেতুর কারনে বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব অংশের ২১ টি জেলা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে আসবে। পদ্মা সেতুতে আগামীতে রেল, গ্যাস, বৈদ্যুতিক লাইন এবং ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে।এই সেতুর কারনে দেশের জিপিও (GPO) বাড়বে ১.২%। ১০০ বছরের স্থায়ীত্বের এই সেতুর কারনে বানিজ্যিকভাবে লাভবান হবে দেশ ও দেশের মানুষ।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু সম্পর্কে ১০টি বাক্য
পদ্মা সেতু নিয়ে স্ট্যাটাস
Frequently Ask Question
Q. পদ্মা সেতু কোন বাংলাদেশের কোন জেলায় অবস্থিত?
পদ্মা বহুমূখী সেতু মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলা এবং মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার একটি ছোট অংশকে সংযুক্ত করেছে।
Q. পদ্মা সেতু বিশ্বের কততম সেতু?
পদ্মা সেতু বিশ্বের ১২২ তম দীর্ঘ সেতু।
Q. পদ্মা সেতু কত তারিখে উদ্বোধন করা হয়?
পদ্মা বহুমূখী সেতু গত ২৫ জুন ২০২২ সালে (শনিবার) দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি 'জয় বাংলা' স্লোগান দেন।
Q. পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কত কিলোমিটার?
পদ্মা সেতুর লম্বায় ১৫০.১২ মিটার এবং চওড়ায় ২২.৫ মিটার। এবং পদ্মা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কি.মি। মানে প্রায় ৩.৮২ মাইল।
Q. পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তের জেলার নাম কি?
পদ্মা সেতুর এক প্রান্তের জেলার নাম মুন্সীগঞ্জ ও অন্যপ্রান্তের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলাকে সংযুক্ত করেছে।
Q. পদ্মা সেতুর অর্থায়ন করেছে কোন দেশ?
২০১২ সালে পদ্মাসেতু বাংলাদেশ সরকারের দেশীয় অর্থায়নে নির্মানের কাজ শুরু করা হয়। এসময় ২০১৪ সালে সেতু নির্মানের জন্য বাংলাদেস সরকার ও চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কোম্পানিটি পদ্মাসেতু নির্মাণের দায়িত্ব হাতে পায়
Q. পদ্মা সেতু ঢাকার সাথে কতটি জেলাকে সংযুক্ত করবে?
পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে ঢাকার মোট ২১টি জেলাকে একসাথে সংযুক্ত করে।
Q. পদ্মা সেতুর টোল তালিকা ২০২২?
মোটর সাইকেল - ১০০ টাকা, কারজিপ-৭৫০ টাকা, পিকআপ -১২০০ টাকা, মাইক্রো-১৩০০ টাকা,মিনি বাস-১৪০০ টাকা, মাঝারি আসনের বাস-২০০০ টাকা, বড় বাস ২৪০০ টাকা। ছোট ট্রাক-১৬০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক-২১০০-২৮০০ টাকা, ট্রেইলার ৫৫০০ টাকা থেকে শুরু।
Q. পদ্মা সেতু নির্মানে খরচ কত?
বর্তমানে পদ্মা সেতু তৈরিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। তবে নতুন সংশোধনের পরে এই ব্যায় বেড়ে দাড়াবে ৩২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে পদ্মা সেতুর প্রথম প্রকল্পটির অনুমোদনের সময় ব্যায় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা।
Q. পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা কত?
পদ্মা সেতু সবথেকে গভীরতম সেতুর মধ্যে অন্যতম। এই সেতুর পাইলের গভীরতা ১২০ মিটার বা ৩৯০ ফুট পর্যন্ত।
Q. পদ্মা সেতুর পিলার ও স্প্যান সংখ্যা কয়টি?
পদ্মা সেতুর মোট পিলার সংখ্যা ৪২টি এবং এর স্প্যান সংখ্যা ৪১টি। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। পদ্মা সেতু ৪ লেনের তৈরি এবং সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০ বছর।
Q. পদ্মা সেতু এশিয়ার কততম দীর্ঘতম সেতু?
বিশ্ব ইতিহাসে পদ্মাসেতুর স্থান প্রথম সারিতেই রয়েছে। পদ্মাসেতুর এশিয়ার মধ্যে বেশ উপরে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেতুর অবস্থান প্রথম। অপরদিকে বৃহত্তম সড়ক সেতুর দিক থেকে পদ্মা সেতুর অবস্থান ২৫ তম এবং পৃথিবীর মধ্যে পদ্মা সেতুর অবস্থান ১২২ তম।
Q. পদ্মা সেতুর উচ্চতা কত?
পদ্মা সেতুর উচ্চতা পানির স্তর থেকে ৬০ ফুট উপরে এবং সেতুর পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট।
উপসংহারঃ
লেখলেই হবে তাড়াহুরো নাই
পদ্মা সেতু রচনা
পদ্মা সেতু অনুচ্ছেদ
পদ্মা সেতু রচনা pdf
পদ্মা সেতু ছবি