১ দিনের ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি | ডে ট্রিপ গাইড

অনেক সময় সবার জন্য একটানা ৩-৭ দিনের ট্যুর প্ল্যান করা সম্ভব হয় না। তারা সপ্তাহে একটা ছুটির দিন অথবা একদিন হুট করে সব কিছু থেকে নিজেকে দুরে নিতে ১দিনের ট্রিপের আয়োজন করে ফেলেন। তবে একদিনের ট্রিপের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি কারন  স্বল্প  সময়ে সবকিছু সম্পন্ন করা পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। আজ আমরা এই আর্টিকেলে ড্রে ট্রিপের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে পারবো।

১ দিনের ভ্রমনে যাওয়ার প্রস্ততি

ডে ট্রিপে যাওয়ার জন্য আপনাকে যে বিষয় গুলা খেয়াল রাখতে হবে এবং যাওয়ার জন্য যে সকল প্রস্তুতি নিবেনঃ

১ দিনের ট্রিপ বা ডে ট্রিপ এর জন্য আপনাকে একটু বেশি তথ্য জানতে হবে। কারন ডে ট্রিপে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্ল্যান না করে ট্রিপে গেলে আপনি ঠিকঠাক তো ঘুরতে পারবেন ই না আবার যানবাহন পাওয়া নিয়ে ও ঝামেলা তে পড়বেন।একদিনের কম সময়ে বেশ কয়েকটা স্থান একসাথে ঘুরে নিতে আগে থেকেই সব খসড়া করে রাখুন।

১ দিনের ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি

১. কোন স্থানে যাবেনঃ

একদিনের ভ্রমনে অবশ্যই স্থান নির্বাচন করতে যে বিষয়টি বেশি নজর দিবেন সেটা হলো দুরত্ব। যাওয়া আসা তে সব সময় নষ্ট হবে এমন স্থান ডে ট্রিপের জন্য এড়িয়ে চলুন। কোন স্থানে দেখার কি কি আছে আগে ইউটিউব বা গুগল থেকে জেনে নিন। পছন্দ মতো কাছাকাছি দুরত্বের কয়েকটা জায়গা বাছাই করে ফেলুন।

পছন্দের আর সুন্দর জায়গা গুলা তালিকার উপরে রাখুন। এবং সাথে আর কয়েকটা জায়গা নিয়ে এক্সট্রা তালিকা করে রাখুন। সময় হলে একসাথে সেগুলাও যেনো দেখে আসতে পারেন। তবে অবশ্যই একদিনে দেখে শেষ করতে পারবেন এমন স্থান নির্বাচন করবেন।

২. কোন সিজনে যাবেনঃ

একেক টা স্থান একেক সিজনের জন্য উপভোগ্য । যেমন আপনি হাওড় জাতীয় স্থানে যেতে চাইলে বর্ষার শুরু থেকে শীতের আগ পর্যন্ত সময়ে গেলে ভালো উপভোগ করতে পারবেন। আবার এমন কিছু স্থান আছে যেগুলা শীতে ঘোরার জন্য পারফেক্ট হবে। যেমন তাহেরপুরের শিমুল বাগান। সেগুলা শীতকালের তালিকায় রাখুন।

গ্রীষ্মকালে আপনি দর্শনীয় কিছু স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। অবশ্যই স্থান নির্বাচনের জন্য ঋতুর বিষয়টি মাথায় রাখুন।

৩. কেমন খরচ হবে

কোথাও যাওয়ার পূর্বে খরচ হিসাব করে সে অনুযায়ী একটা খসড়া করে ফেলুন। ওখানকার সব খরচ আগেই জেনে রাখুন। যাতায়াত ভাড়া (স্থানীয় খরচ সহ), এন্ট্রি ফি (যদি লাগে), শুকনা খাবার ও পানির খরচ, সকালের নাস্তা + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার + বিকেলের/সন্ধ্যার নাস্তা, স্থানীয় কোনো কেনাকাটা থাকলে।

এগুলা আগে থেকে ই হিসাব করে ফেলুন। খরচ হিসাব করার পর এক্সট্রা গোপনে কিছু আলাদা টাকা নিয়ে রাখুন। অবশ্যই স্থানীয় যানবাহনে শহরের অভ্যন্তরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দরদাম করে যাতায়াত করবেন। 

৪. কিভাবে যাবেনঃ

আপনি ঢাকা থেকে আশেপাশে কোনে স্থানে গেলে ফকিরাপুল বা সায়দাবাদ থেকে বাস পাবেন। এছাড়াও কিছু বাস আছে যেগুলো গাবতলি, কল্যাণপুর, কলাবাগান, আব্দল্লাহপুর, উত্তরা এইসব জাইগা থেকেও পাওয়া যায় তবে কম।

আপনি যে স্থানে যাবেন সেখানে ট্রেনে যাতায়াত সুবিধা থাকলে ট্রেন কে বাছাই করতে পারেন ১ম তালিকায়। এছাড়াও লঞ্চ, বিমান যেখানে ভ্রমনে আপনার সুবিধা হবে সেটাই নির্বাচন করুন। তবে যেভাবেই যান না কেনো সম্ভব হলে আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করে রাখুন।

৫. ওখানে দেখার কি কি আছেঃ

আগে থেকে জেনে নিন যেখানে যাবেন সেখানে দেখার কি কি আছে। সেক্ষেত্রে অনেকসময়  আপনার স্পটে গিয়ে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। ঐতিহাসিক কোনো স্থানে গেলে আগেই তার ইতিহাস সম্পর্কে একটু জেনে নিন।

কারন ইতিহাস সম্পর্কে ধারনা থাকলে ইট পাথর ও দেখতে সুন্দর লাগবে। সব স্থানের সবটুকু সৌন্দর্য উপভোগ করার চেষ্টা করুন। পছন্দের জায়গা গুলা পছন্দের বিষয়গুলা এক্ষেত্রে প্রাধান্য দিন।

৬. কি কি সাথে নিবেনঃ

অবশ্যই এখানে এটি জরুরি বিষয়। কারন সামান্য একটি দিনের জন্য অপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে বা সাথে রাখার প্রয়োজন নেই। শুধু মাত্র দরকারি জিনিস গুলা সাথে রাখবেন। রোদের জন্য সানগ্লাস, ছাতা রাখতে পারেন, বৃষ্টির জন্য পকেট রেনকোট, শীতের জন্য অবশ্যই চাদর বা মাফলার রাখবেন সাথে। 

ব্যাগে সবসময়ই পানি আর শুকনা খাবার রাখবেন। যেহেতু একদিনের ভ্রমন তাই অতিরিক্ত পোশাক নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পাওয়ার ব্যাংক, ক্যামেরা এগুলা নিবেন। মেয়েরা ছবি তোলার জন্য চাইলে শাড়ি বা অন্য পছন্দের পোশাক  নিতে পারেন। ব্যাগে পর্যাপ্ত টিস্যু রাখবেন। সম্ভব হলে ব্যাগে মাটিতে  বিছানোর মত মাদুর বা বেডশিট নিয়ে রাখতে পারেন।

৭. স্থানটিতে বন্ধের দিন আছে কি? কখন খোলা থাকে, কখন বন্ধ হয়ঃ

যে স্থানে যাবেন সেই স্থান সম্পর্কে জেনে নিন সেটি সপ্তাহে কোনোদিন বন্ধ থাকে কি না। বন্ধ থাকলে কোন দিন বন্ধ থাকে। আবার কোন সময় পর্যটক ঢুকতে পারবে এটাও জেনে রাখুন। ভোগান্তি এড়াতে এই বিষয়টি নজরে রাখুন।

বন্ধ ও খোলার সময় বিবেচনা করে আপনি প্ল্যান করে  আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলাও কম সময় দেখে নিতে পারবেন। 

৮. কোথায় খাবেনঃ

যে স্থানে ভ্রমন করবেন আগেই জেনে নিবেন ওই স্থানের কোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার আছে কি না। থাকলে অবশ্যই ওটা খাওয়ার চেষ্টা করবেন। অতিরিক্ত তেল চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উত্তম। সাধারণ কোনো খাবার খেতে চাইলে আশেপাশে কোনো পরিষ্কার হোটেল দেখে খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

আবার কেউ চাইলে সাথে কিছু খাবার রাখতে পারেন। চেষ্টা করবেন দর্শনীয় স্থান থেকে একটু দুরে প্রধান সড়কের কাছাকাছি এসে খাবার খাইতে।কারন ভ্রমন স্থানের আশেপাশে খাবার মূল্য তুলনামূলক বেশি থাকে। 

৯. কোথায় বিশ্রাম নিবেনঃ

বেশিরভাগ ডে ট্রিপ গুলা তে সাধারণত রাতে যাত্রা শুরু করে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ব্যাক করা হয় আবার বেশ কাছাকাছি গুলা একদিনের মধ্যে ই গিয়ে ফিরে আসা যায় এজন্য এই ধরনের ভ্রমনে বিশ্রামের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। 

তবে স্থানীয় কোনো হোটেল বা লজ থাকলে সেখানে ঘন্টা চুক্তি তে চাইলে আপনি ফ্রেশ হয়ে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারেন। ঘোরাঘুরি নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই শেষ হয়ে গেলে আপনি আপনার সুবিধা মতো স্থানে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারেন। এজন্য আগেই এই সকল বিষয় সম্পর্কে খোজ নিয়ে রাখুন।

১০. ওই স্থানের আশেপাশে একদিনে ঘোরার মতো আর কোনো স্থান আছে কিঃ

এমন অনেক স্থান আছে যেগুলা ২/৩ ঘন্টার মধ্যে ঘোরা শেষ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপনি সারাদিনের সময় টা কাজে লাগাতে আগেই জেনে রাখুন আশেপাশে আর কি কি দর্শনীয় স্থান আছে, সেগুলা নির্ধারিত স্থান থেকে কতদুর, যাতায়াত মাধ্যম কেমন, নিরাপত্তা কেমন, দেখার কি কি আছে, কত সময় লাগবে ইত্যাদি।

সেক্ষেত্রে আপনি এক দিনে বেশ কয়েকটা স্থান কভার করে ফেলতে পারবেন। আপনার সময় ও নষ্ট হবে না আলাদা ছুটির/ সময় বের করার ও প্রয়োজন হবে না।

১১. স্থানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমনঃ

যে স্থানে ভ্রমন করবেন অবশ্যই নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নিবেন। এমন অনেক কাহিনী আছে যারা ঘুরতে গিয়ে ডাকাতি ও অন্যান্য বিপদের সম্মুখীন হয়। এজন্য চেষ্টা করবেন আশপাশের পরিবেশ ও সুযোগ সুবিধা জেনে ভ্রমন করা।

রাত হয়ে গেলে অপরিচিত কারো থেকে লিফট নিবেন না আবার  কাউকে লিফট দিবেনও না। সাথে ফিমেইল পার্টনার থাকলে আলাদা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করবেন। সাথে শিশু থাকলে  শিশুদের জন্য সুস্থ পরিবেশ হবে এমন জায়গা বাছাই করবেন।

১২. খরচ কমাবেন কিভাবেঃ

ডে ট্রিপে খরচ কমাতে চাইলে একসাথে ৫-৬ জন ফ্যামিলি মেম্বার বা ৫-৬ জন বন্ধু মিলে একসাথে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে সব জায়গা তে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট গুলা সহজে ভাড়া করে নিতে পারবেন।খরচ কম হবে।

আবার একসাথে বেশ কয়েকজন থাকলে নিরাপত্তা বিষয়ে চিন্তা মুক্ত থাকতে পারবেন। ভ্রমনের দিন বা ঠিক আগ মুহুর্তে টিকিট না করে কয়েক মাস আগে টিকিট সংগ্রহ করে রাখুন তাহলে টিকিট মূল্য বেশি দিতে হবে না। কম দামেই টিকিট পাবেন।

কয়েকজন একসাথে গিয়ে খরচ করলে মাথাপিছু খরচ কম হবে। ট্রিপেও আনন্দ করতে পারবেন। তবে একা ভ্রমনে বের হলে ট্রেন ও লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে খরচ কমাতে পারেন।

ডে ট্রিপে যে বিষয় গুলা তে সর্তক থাকবেনঃ

  • অবশ্যই ১ দিনের ভ্রমনে যেগুলা মাথায় রাখবেন-
  • একা থাকলে একা আছেন বিষয়টি গোপন রাখুন।
  • অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার খাবেন না।
  • টাকা বেশ কয়েক জায়গা তে ভাগ করে রাখুন যেনো একটা জায়গা থেকে হারিয়ে গেলে / মিসিং হলে অন্য জায়গা থেকে খরচ করতে পারেন। 
  • রাত অধিক হলে নিরাপত্তা থাকলে ভ্রমন করুন নতুবা ওখানে ভালো স্থান দেখে রাত যাপন করুন।
  • যে স্থান ভ্রমন করবেন সে স্থানের আপনার দ্বারা ক্ষতি হবে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন।
  • স্থানীয় লোকজনের সাথে ঝামেলা তে জড়াবেন না।
  • টিমে গেলে সবার সাথে সহায়তাপূর্ন আচরন করুন। 
  • অতিরিক্ত তেল চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • অসুস্থ অবস্থায় এই ধরনের ট্রিপ এড়িয়ে চলুন।
  • পরিস্থিতি হলে ছুটির দিন গুলা বাদ দিয়ে ট্রিপ প্ল্যান করতে পারেন।নতুবা স্পটে ছুটির দিন গুলা তে ভিড় থাকে এবং সবকিছুর দাম ও থাকে তুলনামূলক ছুটির দিনের তুলনায় বেশি। 

Frequently Ask Question

Q. ঢাকার পাশ্ববর্তী সেরা ১০ টি ডে ট্রিপের স্থান?

১.গোলাপ গ্রাম সাদুল্লাহপুর
২.সোনারগাঁও জাদুঘর 
৩.বাংলার তাজমহল
৪.নিকলী হাওড়,কিশোরগঞ্জ 
৫.পানাম নগর
৬.শিমুল বাগান তাহেরপুর, সুনামগঞ্জ
৭.সোনাইছড়ি ট্রেইল
৮.রাতারগুল, সিলেট
৯.টাঙ্গুয়ার হাওড় 
১০.জাফলং,সিলেট

Q. ১ দিনের ট্যুরের কোনগুলা প্রয়োজনীয় জিনিস? 

জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি,কাবিনামা( যদি থাকে),হালকা শুকনা খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস  যেমন মোবাইল,ক্যামেরা,পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখুন।

Q. ১ দিনের ভ্রমণ প্রস্তুতি কিভাবে নিবেন?

ভ্রমনে যাওয়ার পূর্বে সেই স্থান সম্পর্কে জানার জন্য  সম্ভব হলে অভিজ্ঞ কারো সাথে আলোচনা করে ভ্রমন পরিকল্পনা করবেন।

Q. ১ দিনে ভ্রমনে কোন  বিষয়ে বেশি সর্তক থাকবেন?

ডে ট্রিপে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না। সময়ের দিকে নজর দিবেন।কারন আপনি সময়ের মধ্যে ঘোরাঘুরি শেষ না করলে ওই দিন ই  ফিরে আসতে পারবেন না। 

Q. ১ দিনের ভ্রমনে কেমন  খাবার খাবেন? 

অতিরিক্ত তেল, চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে যাবেন। সম্ভব হলে খাদ্য তালিকায় ক্যালরিযুক্ত খাবার রাখুন ও পর্যাপ্ত পানি পান করুন

Q. ১ দিনের ভ্রমনে কেমন যানবাহন বাছাই করবেন?

একদিনে যদি আপনি ২/৩ টা জায়গা দেখে নিতে চান  এবং একসাথে ৫/৬ জন থাকেন তাহলে আপনার জন্য ভালো অপশন হবে স্থানীয় কোনো বাহন রিজার্ভ করে নেওয়া।

শেষ কথাঃ 
আশা করি এই ড্রে ট্রিপ প্রস্তুতি টি আপনাকে অনেক সহায়তা করবে। আপনার নেক্সট ১ দিনের ভ্রমন টি  আরো সুন্দর করে তুলবে।ভালো থাকুন আর ঘুরতে থাকুন 
মোঃ আল আমিন

একজন প্যাশনেট ব্লগার ও কন্টেন্ট রাইটার। আমি অবসর সময়ে প্রযুক্তি বিষয়ে লেখালেখি করতে ভালোবাসি।

নবীনতর পূর্বতন