দিল্লি থেকে আহমেদাবাদে যাত্রার সময় এক এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে উঠে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন এক যাত্রী। তিনি বিমানের ভেতরের অস্বাভাবিক অবস্থার কথা তুলে ধরে ভিডিও করেন এবং সেটি পোস্ট করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়ে ভিডিও করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সেই বোয়িং ৭৮৭-৮ বিমানটি আহমেদাবাদের মেঘানিনগর এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
আকাশ বাত্সা নামের ওই যাত্রী দিল্লি থেকে আহমেদাবাদে গিয়েছিলেন এআই-১৭১ ফ্লাইটে।
বিমানের মধ্যে প্রবল অস্বস্তিকর অবস্থা নিয়ে তিনি পোস্ট করা ভিডিওটিতে বলেন, ‘আমরা ট্যাক্সি করার অপেক্ষায়, কিন্তু এসি একেবারেই কাজ করছে না। চারপাশে যাত্রীরা গরমে অস্থির হয়ে পড়েছেন। এর ওপর টিভি স্ক্রিন, লাইট–কোনোটাই কাজ করছে না। এটি কি যাত্রীদের জন্য গ্রহণযোগ্য?’ তিনি এসব দৃশ্য ভিডিও করে এক্স-এ পোস্ট করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানের অভ্যন্তরে যাত্রীরা অস্বস্তিতে রয়েছেন এবং নানা যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে আছে।
অকাশের ভিডিও পোস্ট করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এআই-১৭১ ফ্লাইটটি আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের পরপরই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। লন্ডনের গ্যাটউইকগামী এই বোয়িং ৭৮৭-৮ বিমানে তখন ২৪২ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ছিলেন। এদের মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, ১ জন কানাডীয় এবং ৭ জন পর্তুগিজ নাগরিক ছিলেন।
ঘটনার পর অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কি বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটির ইঙ্গিত ছিল আগেই? আকাশের ভিডিও ও অভিজ্ঞতা দেখে অনেকেই বলছেন, ফ্লাইটটি হয়তো উড্ডয়নের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত অবস্থায় ছিল না। এমন অবস্থা সত্ত্বেও বিমানের যাত্রা চালিয়ে যাওয়াটাই বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আহমেদাবাদ নামায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আকাশ বাত্সা অপর একটি পোস্টে লেখেন, ‘আজ রাতে আর এয়ার ইন্ডিয়াতে ফিরছি না। যথেষ্ট হয়েছে।’
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে একজন যাত্রীর পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকেই যদি দুর্ঘটনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির বিষয়েও।
এখন দেখার বিষয়, আকাশের অভিজ্ঞতা ও ভিডিও ভবিষ্যতে তদন্তের কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে কি না।
ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় ২৪১ জন আরোহীসহ ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। বিমানটি ২৪২ জন আরোহী নিয়ে গুজরাটের আহমেদাবাদে বিজে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসে আছড়ে পড়ে। এতে ওই মেডিকেল কলেজের অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীও প্রাণ হারান।
বিধ্বস্ত লন্ডনগামী বিমানটির ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে একজন ছাড়া সবারই মৃত্যু হয়েছে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তিটি হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বিষ্ণু কুমার রমেশ। বয়স ৪০ বছর।
আগুনের গোলার মতো বিস্ফোরিত হওয়া ওই উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে অলৌকিকভাবে বের হয়ে আসেন বিষ্ণু কুমার। গতকোল শুক্রবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভারতের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডিডি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা বর্ণনা করেছেন রমেশ।
জ্বালানিতে পরিপূর্ণ এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি লন্ডনের উদ্দেশে রওনা করেছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই এটি বিস্ফোরিত হয়।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, উড়োজাহাজের ১১এ নম্বর আসনে বসেছিলেন রমেশ। তার ভাইও ছিলেন একই উড়োজাহাজে। যুক্তরাজ্যে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যরা সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রমেশ বলেন, ‘উড্ডয়নের এক মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ মনে হলো কিছু একটা আটকে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম, কিছু একটা ঘটেছে। তারপর হঠাৎ করে উড়োজাহাজের সবুজ আর সাদা আলো জ্বলে উঠল। এরপর মনে হলো উড়োজাহাজটি আরও জোরে ছুটছে। এটি সোজা গিয়ে একটা হাসপাতালের হোস্টেলে গিয়ে ধাক্কা খেল। আমার চোখের সামনেই উড়োজাহাজটা বিধ্বস্ত হলো।’
রমেশ এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সেখানে তার শরীরের পোড়া ক্ষত ও আঘাতের চিকিৎসা চলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল শুক্রবার হাসপাতালে রমেশকে দেখতে যান। মোদির ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের খবরে বলা হয়েছে, রমেশের বয়স ৪০ বছর। তিনি যুক্তরাজ্যের লেস্টার শহরের বাসিন্দা। বার্তা সংস্থাটি রমেশের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে।
রমেশ বলেন, ‘শুরুতে ভেবেছিলাম, আমিও মারা যাচ্ছি। কিন্তু পরে যখন চোখ খুললাম, বুঝলাম, এখনো বেঁচে আছি।’
রমেশ আরও বলেন, ‘আমি সিটবেল্ট খুলে বেরোনোর চেষ্টা করলাম এবং পারলামও। আমার মনে হয়, আমি উড়োজাহাজের যে পাশটায় ছিলাম, সেটি হোস্টেলের দিকে ছিল না। আমি যেখানে নামলাম, সেটি মাটির কাছাকাছি ছিল এবং সেখানে ফাঁকা জায়গাও ছিল। আমার পাশের দরজাটা ভেঙে পড়ার পর দেখলাম, বাইরে জায়গা আছে। আর তখনই ভাবলাম, চেষ্টা করলে বেরিয়ে যেতে পারি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর বিষ্ণু রক্তমাখা টি-শার্ট পরে পা টেনে টেনে হাঁটছেন এবং নিজেই অ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
বিষ্ণু বলেন, ‘আগুনে আমার বাঁ হাতটা সামান্য পুড়ে গেছে। একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আমাকে হাসপাতালে আনা হয়। এখানকার লোকজন খুব ভালোভাবে আমার দেখভাল করছে।’
from Newsbangla24 RSS Feed